বাংলাদেশে মহিষের মাংস জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি বাজারের পরিধিও বাড়ছে।

দেশে মহিষের মাংসের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। গরুর মাংসের চেয়ে সস্তা এবং এর পুষ্টিগুণ বেশি হওয়ায় ক্রেতারা ঝুঁকছেন মহিষের মাংসের দিকে। বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসায় তাদের আর মহিষের মাংসকে গরুর মাংস বলে চালাতে হয় না। মহিষের মাংসকে গরুর মাংস বলে চালিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি এখন আর নেই। বিক্রেতারা মহিষের মাংসকে বিক্রি করছেন ‘মহিষের মাংস’ হিসেবেই। এতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন তারা।

কীভাবে সম্ভব হলো এ পরিবর্তন? খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, পরিবর্তন আসলে এসেছে ক্রেতাদের মানসিকতায়। মানুষ এখন গরুর পরিবর্তে মহিষের মাংস খোঁজ করেন। ধারেকাছে কোথাও না পেলে অনলাইন শপে ঢুঁ মারেন। অর্ডার করলে ঘরে বসেই পেয়ে যান মহিষের মাংস। এ বদলটা ঘটছে অনলাইনে মাংস চালু হওয়ার মাধ্যমে।

শুধু অনলাইন শপ নয়, সারা দেশে Cityumbrella ‘স্বপ্ন’, ‘আগোরা’, ‘মিনাবাজার’ ও ‘প্রিন্সবাজার’-এর মতো জনপ্রিয় সুপার শপগুলোতে এখন ঘোষণা দিয়েই মহিষের মাংস বিক্রি হচ্ছে। এভাবে দেশে গরু-খাসি ও ভেড়ার মতোই দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মহিষের মাংস। দেশে মহিষের মাংসের বাজার বড় হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় হালাল মাংস আমদানিকারক সমিতির তথ্য থেকে।

তাদের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে দেশে মহিষের মাংস আমদানি ও বিক্রি হয়েছিল মাত্র ২০ টন। ২০১৮ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০০ টনে। ২০১৯ সালে সেটি এক লাফে উঠে গেছে ৫ হাজার টনে।

তবে চলতি বছর ২০২০ সালে করোনা মহামারি, দেশি খামারিদের বিরোধিতা আর আদালতে মামলার কারণে আমদানিতে জটিলতা দেখা দেয় এবং দামও কিছুটা বেড়ে যায়। তা সত্ত্বেও মহিষের মাংসের নিয়মিত ক্রেতারা মুখ ফেরাননি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মহিষের মাংস আমদানি ও বিক্রি হয়েছে ১০ হাজার টন।

দেশে মহিষের মাংস জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি বাজারের পরিধিও বাড়ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হালাল মিট ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শামীম আহমেদ বলেন, ‘পণ্য বিক্রিতে অনলাইন শপগুলোর নতুন ধ্যান-ধারণার কারণেই এটি সম্ভব হচ্ছে। তারা এখন ঘোষণা দিয়ে মহিষের মাংস বিক্রি করছে। ক্রেতারাও মহিষের মাংসের খোঁজ করে।

‘তার মানে হচ্ছে মহিষের মাংসের ক্রেতা আছে। মানুষ মহিষের মাংস খেতে চায়। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন মানুষ স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করলে কোরবানি উৎসব ছাড়া গরুর মাংস কমই খাবে।’

তিনি ডেইলি চেইন শপ ‘স্বপ্ন’-এর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘স্বপ্ন ঘোষণা দিয়ে প্রথমবার ১৮ কেজি মহিষের মাংস বিক্রির উদ্যোগ নেয়। এখন তারা দৈনিক আট টন মহিষের মাংস বিক্রি করছে।’

তার আরও দাবি, ‘অনলাইন বা ডেইলি শপেই শুধু নয়, হাটবাজার ও অলিগলিতে স্থায়ী মাংসের দোকানগুলোতেও মহিষের মাংস বিক্রি হতে পারে। কেউ কেউ বিক্রি করছেও। কিন্তু এখনও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মহিষকে গরুর মাংস বলে বিক্রির চেষ্টা করছে। কারণ দেশে এখন মহিষের মাংস ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার মধ্যে। গরুর মাংস বিক্রি হয় ৬০০ টাকা কেজিতে।’

মহিষের মাংস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাপোলো টেকনো ফার্ম লিমিটেডের মালিক এটিএম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সমিতির সদস্যভুক্ত আমদানিকারকের সংখ্যা ৪৫। তারা ইচ্ছা করলেই মহিষকে গরু বলে চালাতে পারবে না। কারণ এইচএসকোড অনুযায়ী সবাই মহিষের মাংসই আমদানি করে। এখানে যা হয়, তা হয় মাঠপর্যায়ের বিক্রেতাদের মাধ্যমে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সমিতি মহিষের মাংসকে মহিষের মাংস হিসেবেই বিক্রির জন্য চাপ দিচ্ছে। না মানলে তাকে মাংস সরবরাহ না করতেও সমিতির নির্দেশনা রয়েছে। এর বাইরে মহিষের মাংসকে ব্র্যান্ডিং করতে অনলাইন শপ ও ডেইলি শপের পাশাপাশি সারা দেশে নিজস্ব চেইন শপে মহিষের মাংস বিক্রি করার পরিকল্পনাও নিচ্ছে সমিতি।’

রাজধানীতে মহিষের মাংস বিক্রির বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম Cityumbrella। এর কর্ণধার জাহিদুল আলম রুবেল বলেন, ‘গরু-খাসি, ভেড়া সব মাংসেরই ব্র্যান্ডিং রয়েছে। মহিষের মাংসেরও ব্র্যান্ডিং করার মতো সব উপাদান আছে।’

মাথাপিছু মাংসের ভোগ ও দাম– ওয়ার্ল্ড ফুড অর্গেনাইজেশনের (ডব্লিউএফও) তথ্য অনুযায়ী, মানবদেহের সুস্থতা রক্ষায় প্রতি বছর মাথাপিছু কমপক্ষে ৪৮ কেজি মাংস খেতে হয়। কিন্তু দেশের ভোক্তারা গড়ে খাচ্ছে মাত্র চার থেকে সাড়ে চার কেজি। অর্থাৎ বিশ্বে মাথাপিছু মাংস ভোগের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে।

দেশের মানুষ মাংস কম খাওয়ার বড় একটি কারণ হচ্ছে দাম। বিশ্বব্যাপী মাংসের গড় দাম কেজিতে ৪ দশমিক ৩৫ ডলার। বাংলাদেশে সেটা ৬ থেকে ৭ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এ দেশে মাংসের দাম ৫০-৬০ ভাগ বেশি।

দাম বাড়ার কারণ হিসাবে আমদানিকারকেরা বলছেন, বর্তমানে আমদানিতে সংকট চলছে। দেশি খামারিরা এ মাংস আমদানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে আদালতে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরও চায় না মহিষের মাংস আমদানি হোক। এ ছাড়া বন্দরে আমদানি করা মাংসের কন্টেইনার খালাস করতে দুই-তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়।

অন্যদিকে সাফটা চুক্তির কারণে ভারত থেকে মহিষের মাংস আমদানিতে শুল্ক হার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ হলেও বিশ্বব্যাপী গড় শুল্কের হার হচ্ছে ৩৩ শতাংশ। এসব কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মহিষের মাংসের দাম বেড়েছে।

অনলাইন শপ Cityumbrella -এ, মহিষের সিনার মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা কেজি। মহিষের রানের গোশত ৪৮০ টাকা কেজি, মাথার মাংস ৩৫০ টাকা এবং কলিজা ২৫০ টাকা। কেন খাবেন মহিষের মাংস গরুর মাংসের চেয়ে মহিষের মাংসের পুষ্টিগুণ বেশি। স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম। এটির দাম গরুর মাংসের চেয়ে কম।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন- পরিমিত পরিমাণের ক্যালোরি ও কোলেস্টেরল এবং উচ্চমাত্রার ভিটামিন ও খনিজ লবণ নিয়ে গঠিত মহিষের মাংস সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর খাবার। প্রতি ১০০ গ্রাম মহিষের মাংসে ১৪০ ক্যালোরি শক্তি থাকে। চর্বি ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ অবিশ্বাস্য কম হওয়ায় নির্দ্বিধায় মহিষের মাংস খাওয়া যায়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগসহ (ইউএসডিএ) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা যায়, মহিষের মাংসে কোলেস্টেরলের পরিমাণ মুরগির চেয়েও কম। এতে ক্যালরি ও প্রয়োজনীয় চর্বিজাতীয় উপাদান গরুর মাংসের তুলনায় অনেক বেশি। প্রোটিনও তুলনামূলক বেশি। গরুর মাংসে চর্বির পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হলেও মহিষের মাংসে তা মাত্র ২ শতাংশ। অন্যদিকে গরুর তুলনায় মহিষের মাংস কম লাল হলেও মহিষের মাংসে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। উভয় মাংসের স্বাদও প্রায় একই রকম।

মহিষের উৎপাদন কেমন বর্তমানে– বিশ্বের ৪০টি দেশে গৃহপালিত মহিষ পালন করা হচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে মোট মহিষের সংখ্যা ১৯ কোটি ৫০ লাখ ৯৮ হাজার ৩১৬টি, যার শতকরা ৯৭ দশমিক ০৯ ভাগ রয়েছে এশিয়া অঞ্চলে।

এশিয়া অঞ্চলের মোট মহিষের ৭৭ দশমিক ৭০ ভাগ দক্ষিণ এশিয়ায়, ১২ দশমিক ১৯ ভাগ পূর্ব এশিয়ায়, ৬ দশমিক ৬৭ ভাগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং শূন্য দশমিক ৫ ভাগের কম পালন করা হয় মধ্য এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে।

বাংলাদেশের গৃহপালিত মহিষ কম-বেশি দেশের সব অঞ্চলেই রয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও মেঘনা নদীর অববাহিকা এবং সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা বিশেষভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশ্বে বেশি মহিষ আছে এমন শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান প্রথম, যাদের মহিষের সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখ। আর বাংলাদেশে মহিষ আছে ১৫ লাখ।

Scroll to Top