লিভ টুগেদার মূলত এক ধরনের বিয়েই।

হলিউডের এঞ্জেলিনা জলি-ব্রেডপিট সহ পৃথিবীর বিখ্যাত সব জুটি দীর্ঘদিন লিভ টুগেদার করার পর যখন বিয়ের চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখনই যেন বিদায়ের ঘণ্টা বাজে।

লিভ টুগেদার মূলত এক ধরনের বিয়েই। পাশ্চাত্য সমাজে গ্রহণযোগ্য, সবাই জানে এবং সহজে মেনেও নেয়। ডিভোর্সে সম্পদের ভাগবাটোয়ারা থেকে রক্ষা পেতে তাঁরা সরকারের লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হতে নারাজ। মুসলিম আইনে দুজন পুরুষের সামনে আল্লাহ্‌র নামে দুজনে স্বামী-স্ত্রী মেনে নেওয়াটাই বিয়ে। পরবর্তীতে নারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে রেজিস্ট্রিকৃত কাবিন নামা মূলত সরকারের সিদ্ধান্ত।

কানাডায় তরুণ সদ্য বিবাহিত এক দম্পতীর সংসারে বছর না পেরোতেই ভাঙ্গনের শব্দ শুনা যায়। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলছিল ছেলেটির সংসারে ওর বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাই সবাই থাকে। অথচ মেয়েটির একমাত্র আদরের ছোট ভাই এই বাড়িতে এসে বসবাস করুক চায় না স্বামী। ওদিকে দেশ থেকে সকাল বিকাল মায়ের তাগদা আমাদের জন্য স্পন্সরশিপ পাঠাও আমাদের কানাডা নিয়ে যাও। মেয়েটি মাকে বুঝাতে পারে না চাইলেই সম্ভব নয়, সীমাবদ্ধতা আছে।

মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম, এতদিন প্রেম করেছো বিয়ের আগেই সবকিছু আলোচনা করে নাওনি কেন? নীচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি লুকালো।

সমস্যাটা এখানেই। প্রেমের সময় কেবলই মুগ্ধতা আর যৌনতার হাতছানি। কিন্তু সংসার জীবনে মুগ্ধতার অবসান, যৌনতা কেবলই অভ্যস্ততা। চাওয়া পাওয়া সহ অন্য সব ব্যাপারগুলো তখন একে একে প্রকাশিত হতে থাকে যা নিয়ে তাঁরা আগে কখনো ভাবেনি কিংবা কথা বলার প্রয়োজনই মনে করেনি।

বিয়ের আগে তাঁরা একসাথে ঘুরতে যাচ্ছে সারাক্ষণ হাতে হাত ধরে বেড়াচ্ছে কিন্তু প্রেমে টুইটুম্বুর অবস্থা বিয়ের সাথে সাথেই পরিসমাপ্তি। নতুন করে যোগ হয় দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ, বাস্তবিক জ্ঞান, কর্ম দক্ষতা আর স্বার্থের টানাপোড়েন। সকালের নাস্তা কে বানাবে, বাসন কে মাজবে, ঘরবাড়ি কে পরিষ্কার করবে? তাঁর উপর দুই পরিবারের সাথে এডজাস্টমেন্ট।

এতদিন মুগ্ধতাভরা চোখে স্বামী/স্ত্রী তখন অন্যদের দেখে বুঝে এই গুণটি তাঁর স্ত্রী/ স্বামীর মাঝে অনুপস্থিত। নিজের স্বামী/স্ত্রী কে তখন ভালো লাগে না আর বরং অন্যের স্ত্রী/স্বামীর প্রতি মুগ্ধতা বাড়তে থাকে। জীবনে যোগ হয় নতুন মাত্রা –না পাওয়া আর আফসোস।

দম্পতী মানে কেবলই প্রেম নয় দায়িত্ব আর কর্তব্যের মিশেল। স্ত্রী মানে সাজগোজ করে পার্টিতে যাওয়া নয় একে অপরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, একে অপরের পরিপূরক হওয়া, বিপদে সাহায্য করা। নিছক আড্ডা কিংবা আলোচনায় পারিবারিক কিংবা সামাজিক প্রোগ্রামে নিজের সরব উপস্থিতি। নতুবা সৌন্দর্য বা রূপও তাঁর আবেদন হারায়।

দেশে থাকা মেয়েটির পরিবার জানছেও না কিংবা বুঝতেও অক্ষম মেয়েটিকে এই মুহূর্তে কি পরিমাণ চাপে তাঁরা ফেলছে। মেয়েটি শ্যাম রাখি না কুল রাখি অকূল পাথার ভেবে ভেবে অসুস্থ হয়ে পরেছে।

যত প্রেমই থাকুক বিয়ে করার আগে ডেটিং এ কেবল খুনসুটি, প্রেমময় কথাবার্তা কিংবা যৌনতা নয় একে অপরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিবার, তাঁর পছন্দ-অপছন্দ, কর্ম দক্ষতা, গুণ, আবেগ, মানসিকতা, আর্থ সামাজিক চিন্তাধারা, কম্পিটিবিলিটি অর্থাৎ আপনার সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতা রাখে কি না জানা এবং বুঝার চেষ্টা করুন।

জীবন চলার পথে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে অর্থ। তা কিভাবে আয় হবে, কিভাবে খরচ হবে, কার পারটিসিপেসন কেমন থাকবে তাও আলোচনা করা জরুরী। যদি কেউ ভণিতা করেন জোর করে মিথ্যার মুখোশ এঁটে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেন বিয়ের পর সেই সম্পর্ক কেবল নরকে পরিণত হবে।

বিয়েতে হার-জিতের কোন ব্যাপার নেই। কোটি টাকা খরচ করা অনেক বিয়েও সহজেই ভেঙ্গে যায় আবার কোনরকমে কম খরচের বিয়েও সুখের হতে পারে। প্রয়োজন কেবল দুজনের সঠিক বুঝাপরা আর যোগ্যতা।

অনেকে বলতে পারেন বিয়ে কি কর্পোরেট অফিস কিংবা বাণিজ্য নাকি যে এতো হিসেবের বেড়াজাল? আমি বলবো এই যুগে হিসেবটাও বড় জরুরী। বিয়ে মূলত একটি চুক্তিই তো শর্তগুলো আগে আলোচনা করা থাকলে মেনে নিতে কিংবা মানিয়ে নিতে সুবিধা হয়।

আমাদের পিতা-মাতা এমন কি আমাদের দাম্পত্যে আমরা গুরুজন, পরিবার এবং সমাজকে প্রাধান্য দিয়ে পছন্দ না হলেও মেনে নিতাম কিন্তু এ যুগের ছেলে-মেয়েরা কোন কিছুরই তুয়াক্কা করে না, না পরিবার না সমাজ।

সে যুগে স্বামী/স্ত্রী নিদৃষ্ট ছক মেনে চলত। স্বামী উপার্জন করবে স্ত্রী সংসার সামলাবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এখন নারীরাও উপার্জনে এগিয়ে এসেছে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ং সম্পূর্ণ বলে চাহিদারও রকম-ফের আছে।

অপরদিকে পুরুষও চায় স্ত্রী সর্বক্ষেত্রে তাঁর পাশে থাকুক, বন্ধুর মত তাঁকে গাইড করুক বুদ্ধি পরামর্শ দিক, পরিবারে অবদান রাখুক, মায়ের মত সেবা করুক।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় রোমান্টিক নারী/পুরুষের চেয়ে হিসেবী নারী/পুরুষ দাম্পত্যে বেশী সফল হয় কারণ সেখানে আবেগের চেয়ে হিসেব এবং বাস্তবতা বেশী থাকে, সংসার জীবনের জন্য যা অতীব জরুরী।

সংসার জীবনে বেহিসেবি, বেখেয়ালি কিংবা অগোছালো হওয়া মানে পিছিয়ে পরা। আপনার একদিনের রাত জাগা কিংবা ভোরে উঠতে না পারা মানে সকালের নাস্তা হবে না, আপনার সন্তান স্কুলে যেতে পারবে না আরও নানাবিধ সমস্যার পাহাড়।

একে অপরের জীবন যাপন পদ্ধতি সম্বন্ধে জানুন। এমন কি প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় সমস্ত খুঁটি নাটি বিষয়গুলো অবহিত হওয়ার চেষ্টা করে তাঁর বেক্তিত্ব ও জীবন বোধ সম্পর্কে বুঝার চেষ্টা করুন, নিজের সাথে মিলিয়ে নিন।

বিয়ের আগে আলোচনার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। নতুন জীবন শুরু করতে অন্ধ আবেগের চেয়ে বাস্তববাদী হওয়া বেশী জরুরী। কারণ অবাস্তব স্বপ্ন কখনো পুরন হবার নয়। বাস্তবতার নিরিখে স্বপ্ন দেখুন, বিয়ের পরে গেঞ্জাম, ঝগড়া, মারামারি- কাটাকাটির চেয়ে বিয়ের আগেই হিসেব কষে বুঝে নিন কতোটুকু ছাড় দিতে পারবেন, কতোটুকু মানিয়ে নিতে পারবেন কতোটুকু নয়।

লেখকঃ Khugesta Nur E Naharin

Scroll to Top