শ্রদ্ধাঞ্জলি- ফজলে লোহানী। সাংবাদিক, লেখক, টিভি উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- ফজলে লোহানী। সাংবাদিক, লেখক, টিভি উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক।
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পথিকৃৎ ফজলে লোহানী বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “যদি কিছু মনে না করেন”-এর উপস্থাপক হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী ১৯৮৫ সালের ৩০ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। বিশিষ্ট টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯২৮ সালের ১২ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। লেখক হিসেবেও তিনি অনেক সুনামের অধিকারী ছিলেন। ফজলে লোহানী লেখক হিসেবে গল্প আর প্রবন্ধ লিখতেন। ফজলে লোহানী ‘পেনশন’ নামে একটি সৃজনশীল চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন।১৯৫০-এর দশকে ফজলে লোহানী সম্পাদিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘অগত্যা’ যেমন রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক রচনাবলির মাধ্যমে সমাজ সচেতন মানুষের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিল, তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ’৮০-এর দশকে তার উপস্থাপনা, সম্পাদনা ও নির্দেশনায় তৈরি টিভি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’ লাখো দর্শকদের জীবনকে বিপুলভাবে আলোড়িত করে, সচেতন করে এবং সংবেদনশীল হয়ে উঠতে উজ্জীবিত করে।
টিভি মিডিয়া কাজ করা আজকের প্রজন্মের অনেক নির্মাতাই হয়তো ফজলে লোহানী সম্পর্কে জানেন না। কিন্তু যারা পথ তৈরি করেছে এবং পথ দেখিয়েছে তাদের অবদান অবশ্যই আমাদের স্বীকার করতে হবে। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে ফজলে লোহানীর মতো কৃতিজনদের জীবন ও কর্ম। আশ্চর্য এক মায়াকাড়া চাহনি ছিল তার । তারচেয়ে চমৎকার ছিল তার কথা বলার ভঙ্গি আর অভিব্যক্তি। মানবিক আবেগে ফজলে লোহানীর কণ্ঠের কান্নাভেজা শব্দমালা আজো বাজে অনেকের মনে। আকর্ষণীয় উপস্থাপন, সুস্থ বিনোদনের পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় মানবিক আবেদনময়ী বিষয়বস্তুর জন্য ‘যদি কিছু মনে না করেন’ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দেশের সব শ্রেণীর আমলা, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের টেলিভিশনের পর্দার কাছে নিয়ে এসেছিল। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তার অনন্য নজির সৃষ্টির পাশাপাশি এটি একটি সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে।
১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিক্ষা ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও পরিচালনা করে সুপরিচিত হয়ে উঠেন। তবে তুমুল জনপ্রিয়তা পান নিজের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত “যদি কিছু মনে না করেন” ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করে। অনুষ্ঠানটি ১৯৭৯ সালে থেকে তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। সাংবাদিক-সাহিত্যিক-চলচ্চিত্র প্রযোজক এতোসব পরিচয় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তার ‘যদি কিছু মনে না করেন’-এর আড়ালে। হ্যাঁ, টিভি মিডিয়ার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জনক তিনি। বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার প্রথম জনপ্রিয় উপস্থাপক। আজও তার গড়ে তোলা কাঠামোতেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সব ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান।
ফজলে লোহানী (জন্মঃ ১২ মার্চ, ১৯২৮ – মৃত্যুঃ ৩০ অক্টোবর ১৯৮৫) সিরাজগঞ্জ জেলার কাউলিয়া গ্রামে এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবু লোহানী ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। মা ফাতেমা লোহানী ছিলেন কলকাতা করপোরেশন স্কুলের শিক্ষিকা। বড় ভাই ফতেহ লোহানী ছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা, আবৃত্তিকার, চিত্রপরিচালক, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও বেতার ব্যক্তিত্ব। ফজলে লোহানীর পুরো নাম ছিল আবু নাঈম মোহাম্মদ ফজলে আলী খান লোহানী।
লেখক, সাংবাদিক ও টিভি উপস্থাপক ফজলে লোহানী সম্বন্ধে জানতে গেলে তার শৈশব ও পারিবারিক বেড়ে ওঠার পরিমণ্ডলে একটু চোখ বুলানো প্রয়োজন। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, চৌধুরী মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী ও আবু লোহানীর মতো বাঙালি বুদ্বিজীবী ও দিকপাল সাহিত্যিকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আন্তরিক পরিশ্রমে ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯১৭-১৮ সালে গঠিত কমিটিতে আবু লোহানী অন্যতম সহকারী সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ১৯২৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে আবু লোহানী তিন সন্তান রেখে যান। ফতেহ লোহানী, হুসনা বানু খানম ও ফজলে লোহানী। ফজলে লোহানী ছিলেন সবার ছোট, মাত্র এক বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। মা, ফাতেমা লোহানী ছিলেন শিক্ষিতা, ধৈর্যশীলা প্রত্যয়দীপ্ত নারী। কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে তিনি সন্তানদের লালন-পালন ও সুষ্ঠু শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্যচর্চাও করতেন। সাহিত্যনুরাগী আবু লোহানী ও ফাতেমা লোহানীর মতো পিতা-মাতার সংসারে ফজলে লোহানী কৈশোর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি ও সাহিত্য অঙ্গনের মহান ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান।
ফজলে লোহানী সিরাজগঞ্জ বিএল স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি কাসে ভর্তি হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেননি। ভারত বিভাগের পর তিনি অন্য কয়েকজনের সাথে ঢাকা থেকে সাপ্তাহিক পূর্ববাংলা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের সাথে যুক্ত হন। ১৯৪৯ সালে তার সম্পাদনায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘অগত্যা’।
স্কুল জীবনের পড়াশোনা শেষ করে ফজলে লোহানী পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। ফাইনাল পরীক্ষায় অত্যন্ত ভালো ফলাফলের জন্য তাকে গোল্ড মেডেল দেয়া হয়। পাক ভারত বিভক্তির পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে এসে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার আগেই তিনি সদ্যস্বাধীন দেশে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
পিতা আবু লোহানীর পদচিহ্ন অনুসরণে ১৯৪৯ সালে তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু হয় তদানীন্তন পাকিস্তান অবজারভারে সহ-সম্পাদক হিসেবে। বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষায় সাবলীল ও পারদর্শী সুপণ্ডিত ফজলে লোহানী ১৯৫১ সালে যোগদান করেন দৈনিক সংবাদে। তিনি ছিলেন দৈনিক সংবাদের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সম্পাদক। এরপর ফজলে লোহানী ইংরেজি দৈনিক ‘দি পাকিস্তান পোস্ট’ এর বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন।
তাসিকুল আলম খান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও ফতেহ লোহানীর সঙ্গে মিলে ১৯৫৩ সালে বের করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারি মাসিক পত্রিকা ‘অগত্যা’। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মাসিক ‘অগত্যা’ ছিল প্রগতিশীল এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। এর রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক রচনাবলি অল্প সময়ের ভেতর সমাজসচেতন পাঠকদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এক সময় ‘অগত্যা’ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়। ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও সামাজিক প্রভাবে ভীত হয়ে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার এর প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে।
আধুনিক বাংলাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান তার আত্মজীবনী ‘কালের ধুলায় লেখা’য় অগত্যা সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, একদা সাড়া জাগানো ফজলে লোহানী সম্পাদিত মাসিক ‘অগত্যা’র কথা। এ পত্রিকাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন ফজলে লোহানীর অগ্রজ ফতেহ লোহানী। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ‘অগত্যা’র অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন। ফজলে লোহানী এবং মুস্তাফা নূরউল ইসলামের লেখনী থেকে নিঃসৃত হতো অনেক রসালো রচনা, নানা চুটকি। ফতেহ লোহানী ছদ্মনামে নিয়মিত লিখতেন অনুজের পত্রিকায়। সেসব লেখায় প্রচুর হাসি-মশকরা থাকত। বহু পাঠক ‘অগত্যা’ পড়তেন বিমল আনন্দ লাভের জন্য। হাসি-মশকরা উদ্দিষ্ট ব্যক্তিরা বেজায় চটতেন, সন্দেহ নেই। ১৯৫২’র বাংলা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারীদের ভেতর ফজলে লোহানী ছিলেন একজন অগ্রণী সৈনিক। এ সময় তিনি রচনা করেন বহুল আলোচিত কবিতা ‘একুশের কবিতা’।
ফজলে লোহানী পঞ্চাশের দশকে ইংল্যান্ড যান এবং লন্ডনের বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে চাকরি করেন। লন্ডনে, বিবিসিতে কর্মরত সময়ে সুদর্শনা শিক্ষিতা ব্রিটিশ নারী এলিজাবেথ হডজিনসের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয় এক সময় প্রণয়ে গড়ায়। ১৯৫৯ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফজলে লোহানীর ঘটনাবহুল বৈচিত্র্যময় জীবনে এলিজাবেথ ছায়ার মতো সবসময় পাশে ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি এলিজাবেথকে নিয়ে ঢাকায় আসেন।
ষাটের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশে ফিরে এসে ফজলে লোহানী সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। সমাজবাদী চেতনায় বিশ্বাসী ফজলে লোহানী মওলানা ভাসানীর অনুসারী হিসেবে দেশের কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ফজলে লোহানী মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং মওলানা ভাসানীর সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় বাম রাজনীতির দীক্ষায় উজ্জীবিত এলিজাবেথ লোহানী মাথায় লাল কাপড় বেঁধে দলের বিভিন্ন কর্মী সম্মেলনে যোগ দিতেন।
রাজনৈতিক কারণে ফজলে লোহানীকে অনেকবার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রথমে ভারতে যান এবং পরবর্তী সময়ে লন্ডনে একজন সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তিনি কর্মতৎপর ছিলেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে ফজলে লোহানী ভাষানী ন্যাপে যোগদান করেন এবং ১৯৭৩ সালে ভাসানী ন্যাপের টিকিটে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে ফজলে লোহানীর নির্বাচন প্রচারণায় এলিজাবেথ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে রাজনৈতিক কারণে ফজলে লোহানী গ্রেফতার হলে তিনি ওয়ার্ল্ডভিশনে যোগদান করেন। ফজলে লোহানীর মৃত্যুর পর এক সাক্ষাৎকারে এলিজাবেথ বলেন, ‘আমি সত্যিই ভাগ্যবতী এ কারণে, ফজলে লোহানীকে বিয়ে করে আমি দুস্থ মানুষের সেবায়ই আত্মনিয়োগ করতে পেরেছিলাম। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন খুবই পরিশ্রমী, তাকে কখনও রাগতে দেখিনি।’
আজকের সময়ে তো প্রতিদিনই বিভিন্ন চ্যানেলে ডজন ডজন টিভি রিপোর্টিং চোখে পড়ে। বাংলাদেশ টেলিভিশন মিডিয়ার ইতিহাসে সত্যিকার অর্থে টিভি রিপোর্টিং চালু করেন ফজলে লোহানী। ‌প্রতি পনের দিন পর পর বিনোদনমূলক নানা আয়োজনে ভরপুর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠান নিয়ে দর্শকদের সামনে আসতেন তিনি। অনুষ্ঠানে শেষ অংশে থাকতো একটি করে টিভি রিপোর্টিং।
ফজলে লোহানীর এই টিভি রিপোর্টিং দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ টিভি দর্শক বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন। বিশ্বখ্যাত টিভি রিপোর্টারদের মতোই গভীর অভিব্যক্তি নিয়ে হৃদয়ছোঁয়া ভঙ্গিমায় তার করা টিভি রিপোর্টিং মানুষকে কখনো হাসাতো, কখনো কাঁদাতো, কখনোবা করে তুলতো বেদনা ভাড়াক্রান্ত কিংবা ক্ষুব্ধ। সেই আশির দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে টিভি রিপোর্টিং এর প্রবর্তন ঘটানোর মতো যুগান্তকারী কাজ তিনি করেছেন। এসিড-নিক্ষেপের ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতার শুরুটা তাঁর হাত ধরেই। বাল্য বিবাহর বিরুদ্ধেও তিনি জনমত তৈরি করেন।
ফজলে লোহানী ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিক্ষা ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও পরিচালনা করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তার পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’ সে সময়ে দর্শকশ্রোতা মহলে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রসঙ্গত, বিবিসির ‘ইউ আস্ক ফর ইট’ নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের অনুসরণে প্রয়াত ফজলে লোহানী বিটিভির জন্য “যদি কিছু মনে না করেন” নামে ঐ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি করতেন। সে সময় হানিফ সংকেত ছিলেন একজন কৌতুকাভিনেতা এবং ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে তিনি ফজলে লোহানীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। দর্শকসারি থেকে তাকে টিভিপর্দায় নিয়ে আসেন ফজলে লোহানী।
ফজলে লোহানী ১৯৮৫ সালের ৩০ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে সে সময় টিভি দশর্কসহ সকল স্তরের মানুষ গভীরভাবে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশে সমাজের অসংলগ্নতা, অনিয়ম এবং অবিচার সাধারণ মানুষের কাছে সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করতেন ফজলে লোহানী। তার অনেক প্রতিবেদন সমাজ জীবনে যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এ দেশের মানুষ তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তার কর্মময় জীবনের স্মৃতিগাথা এমনি উজ্জ্বল হয়ে অম্লান থাকুক চিরদিন আমাদের সবার হৃদয়ে।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, ফজলে লোহানী : শাকিব লোহানী – দৈনিক যুগান্তর, ইন্টারনেট
Scroll to Top