সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলি – ফজলে রাব্বি।

সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলি – ফজলে রাব্বি।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প উসকে দিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে ২০০ বছর শাসন টিকিয়ে রাখে। আবার যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো তখন আমরা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। ধর্মের ভিত্তি পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানকে একঘরে রাখতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যায়, অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের আপামর জনতা প্রতিবাদ করতে থাকে। ফলে নানা ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বিশ্বের বুকে সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের নাম ধারণ করে। তখন থেকেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সূচনা। আমাদের দেশ তথা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলা হয়ে থাকে। বিশ্বে বিদ্যমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম উদাহরণ বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে প্রগতিশীল লেখক আহমদ ছফাও বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক দেশ হলো বাংলাদেশ। আমাদের সংবিধানেও নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা আছে। সংবিধানের ৪১ (১ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রয়েছে। সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব-সংঘাত কোনো জাতির কল্যাণ বয়ে আনে না। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় না থাকলে সাধারণ নাগরিকের ক্ষয়ক্ষতি এবং রাষ্ট্র প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে গেলেও এখনো দেশের ভেতরে একদল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের কারণেই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ হঠাৎ করেই যেন অস্থির হয়ে ওঠে। সম্প্রতি কুমিল্লা নগরীর নানুয়ার দীঘিরপাড়ের ঘটনা নিয়ে দেশে আবারও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে স্বার্থান্বেষী মহল অপচেষ্টায় লিপ্ত। বিবেকবান, মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন মানুষ অন্য ধর্মকে যেমন অবমাননা করতে পারে না তেমনি সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা এবং পূজামণ্ডপে ভাঙচুর চালাতে পারে না। কুমিল্লার পূজামণ্ডপের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতার জেরে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ-পরবর্তী পুলিশের সঙ্গে সাধারণ জনতার সংঘর্ষ এবং নোয়াখালীর চৌমুহনীতে বেশ কয়েকটি মন্দিরে হামলা, পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের সংঘর্ষে ১৮ জন আহত এবং এক জন নিহত হয়। এসব ঘটনা বিচার বিভাগীয় কমিটি দ্বারা সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এসব অপতৎপরতা প্রতিরোধে দেশের প্রচলিত বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার আগে ভাবতে হবে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান-আমরা সবাই একই রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। সবাই এই দেশের আলো, মাটি, পানি, বাতাস গ্রহণ করেই বড় হয়েছি। সবাই এই দেশেরই সন্তান। চণ্ডীদাস যর্থাথই বলেছেন-‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ আমাদের নবি রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মোহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্টই বলেছেন, ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে না; কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তাই সবাই মিলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি, সবার জন্য নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলি।

Scroll to Top