হযরত মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় সাধক বাল‘আম ইবনে বাঊর গজবে পতিত

হযরত মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় সাধক বাল‘আম ইবনে বাঊর গজবে পতিত।

বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, জাব্বারিন সম্প্রদায়ে একজন মহান সাধক ছিলেন, তাঁর নাম বাল‘আম ইবনে বাঊর। তিনি বাইতুল মুক্বাদ্দাসের নিকটবর্তী কেনানের অধিবাসী ছিল। যে কোনো সমস্যায় তিনি ইস্তেখারার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করে সমাধান আনতে পারতেন। হযরত মুসা (আ.) যখন বনি ইসরাইলকে সাথে নিয়ে লোহিত সাগর পার হয়ে গেলেন, আর ফেরাউন ও তার অনুসারীরা পানিতে ডুবে ধ্বংস হয়ে গেল, ঘঁটনাটি এর পরের।

মিসর জয়ের পর হযরত মুসা (আ.) বনি ইসরাইলকে নির্দেশ করলেন, তোমরা আমার সাথে জাব্বারিন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হও। তখন জাব্বারিন সম্প্রদায় দেখতে পেলো যে, হযরত মুসা (আ.) বনি ইসরাইল ও তার সৈন্য-সহ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে আছেন। অথচ এ কাফেলার মোকাবিলা করার ক্ষমতা তাদের নেই। আর জাব্বারিন সম্প্রদায় এটাও অবগত ছিল যে, ফেরাউন ও তার অনুসারীরা হযরত মুসা (আ.)-এর মোকাবিলায় শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়েছে এবং সাগরের অথৈ পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ধ্বংস হয়েছে। ফলে জাব্বারিন সম্প্রদায়ের মনোবল এমনিতেই ভেঙ্গে পড়ল। তখন তারা সবাই মিলে বাল‘আম ইবনে বাঊরের কাছে সমবেত হলো এবং বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়ের উত্তম ব্যক্তি! মুসা (আ.) অতি কঠিন লোক, তদুপরি বিপুল সংখ্যক লোকজনও রয়েছ তাঁর সাথে; তারা এসেছে আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার জন্য। হে বাল’আম ইবনে বাঊর! আপনি আমাদের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার দরবারে প্রার্থনা করুন, যেন তিনি তাদেরকে আমাদের মোকাবিলা থেকে ফিরিয়ে দেন। উল্লেখ্য, বাল‘আম ইবনে বাঊর ইসমে আজম জানতেন, ইস্মের মাধ্যমে তিনি যে দোয়া করতেন তাই কবুল হতো। বাল‘আম বললেন, হে জাব্বারিন সম্প্রদায়! অতি পরিতাপের বিষয়, তোমরা একী বলছ! হযরত মুসা (আ.) হলেন- আল্লাহর রাসুল, তিনি আল্লাহর শক্তিতে শক্তিমান। আমি কীভাবে তাঁর বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে পারি? অথচ আল্লাহর দরবারে তাঁর অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কেও আমি অবগত রয়েছি। আমি যদি এ কাজ করি তবে নিশ্চিত আমার ইহকাল-পরকাল সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু জাব্বারিন সম্প্রদায়ের প্রভাবশালীরা বাল‘আমকে এমনভাবে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো যে, অবশেষে তিনি বললেন, আচ্ছা, তাহলে আমি আমার পালনকর্তার নিকট থেকে জেনে নেই যে, এ বিষয়ে দোয়া করার অনুমতি আছে কি না? তিনি তার নিয়মানুযায়ী বিষয়টি জানার জন্য ইস্তেখারা করল।

অতঃপর ঐ রাতেই তাকে স্বপ্নযোগে বলা হলো, সে যেনো এমন কাজ কখনো না করে। তারপর বাল‘আম জাব্বারিন তার সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিলো যে, তাকে মহান আল্লাহ্ বদদোয়া করতে নিষেধ করেছেন। এ অবস্থায় সমাজপতিরা বাল‘আমকে তাদের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করানোর জন্য নতুন কৌশল অবলম্বন করল। তারা তাকে একটি লোভনীয় উপঢৌকন দিলো। প্রকৃতপক্ষে সেটি ছিল উৎকোচ, তথা মোটা অংকের একটি ঘুষ। অন্যদিকে সমাজপতিরা কৌশলে বাল‘আমের স্ত্রীকে-ও এ কাজে সহায়তা করার জন্য রাজি করে ফেলল। বাল‘আম স্ত্রীর পরামর্শে ও অর্থের মোহে অন্ধ হয়ে গেলো। ফলে বাল‘আমের বিবেকের উপর তার নফ্সের কুপ্রবৃত্তি ও লোভ রিপু প্রাধান্য বিস্তার করল। ফলশ্রুতিতে বাল‘আম হযরত মুসা (আ.) এবং বনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে আরম্ভ করে। আর সেই মুহূর্তেই একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে যায়। বাল‘আম হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে গিয়ে যেসব বাক্য বলছিল, সেসবই নিজ সম্প্রদায়ের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হচ্ছিল। তখন সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল যে, হে বাল‘আম তুমি যে আমাদের জন্যই বদদোয়া করছ! জবাবে বাল‘আম বলল, এটা আমার ইচ্ছাকৃত নয়, আমার জিহ্বা আমার কথা শুনছে না, সে যে আল্লাহ্র সৃষ্টি তাঁর নির্দেশে, তাঁরই ইচ্ছায় সে কথা বলছে। তারপর ফল দাঁড়ালো এই যে, জাব্বারিন সম্প্রদায়ের উপর গজব নাজিল হলো এবং তারা ধ্বংস হয়ে গেলো। আর অর্থের মোহে অন্ধ হয়ে হযরত মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বাল‘আমের শাস্তি হলো এই যে, তার জিহ্বা বেরিয়ে এসে বুকের উপর ঝুলে পড়ল। আল্লাহ্র এই গজবে গ্রেফতার হয়ে বাল‘আম চিৎকার করে উঠল এবং আপন সম্প্রদায়কে ডেকে বললেন, তোমাদের উৎকোচ গ্রহণ করে মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আমার দুনিয়া ও আখিরাতের সবই ধ্বংস হয়ে গেলো।

এভাবেই বাল‘আম ইবনে বাঊরের মতো একজন উচ্চ স্তরের সাধক শুধুমাত্র হযরত মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে বদদোয়া করার অপরাধে আল্লাহর গজবে নিপতিত হয়। যে মুখ দিয়ে তিনি মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন সেই মুখ থেকে জিহ্বা বেরিয়ে আসে, এ ঘটনা সংঘটিত করে মহান আল্লাহ্ প্রমাণ করেছেন, হযরত মুসা (আ.) আল্লাহ্র প্রেরিত মহামানব, তিনি সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর কায়েম রয়েছেন। আর প্রেরিত মহাপুরুষদের বিরুদ্ধাচরণ করলে আল্লাহ্র গজবে পতিত হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অপমান ও জিল্লতির জীবনে নিক্ষিপ্ত হতে হয়। এভাবেই মহান রাব্বুল আলামিন হযরত মুসা (আ.)-এর জমানায় অলৌকিক মু’জিযা সংঘটিত করে সত্য ও মিথ্যার দু’টি পথ আলাদা করে দেখিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন কোন পথে কোন মতে তিনি রয়েছেন। আর এ ব্যবস্থাপনা নবুয়তের যুগে যেমন কায়েম ছিল, তেমনি হযরত রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে নবুয়তের যুগের পূর্ণতা ও পরিসমাপ্তির পর বর্তমান বেলায়েতের যুগেও আল্লাহ্ এ জাতীয় ঘটনা সংঘটিত করে সিরাতুল মুস্তাকিম তথা মোহাম্মদী ইসলামের সত্যতা প্রমাণ করে চলেছেন।

[তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী, ৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা : ২২৬-২২৮ থেকে সংকলিত]

Scroll to Top