ভারতে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচার ও পটভূমিকা- ১ম পর্ব।

ভারতে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচার ও পটভূমিকা- ১ম পর্ব। লেখকঃ আশেকে রাসুল আক্কাস আলী।

১৯৯০ সালের প্রথম দিকে ঢাকা মীরপুরের নেসার ও আজীম ভাই ঢাকা থেকে কলকাতার খিদিরপুরে আত্মীয়ের বাড়ীতে আসেন৷ খিদিরপুরের তখন ছোটখাট ডন ছিলেন শরীফ মিঞা৷ এই শরীফ মিঞা পিঠের শিরদাঁড়ার যন্ত্রনায় ভুগছিলেন৷ নেসার আজীমরা ছিলেন সুফী সম্রাট হযরত শাহ দেওয়ানবাগী হুজুরের মুরীদ সন্তান৷ তারা শরীফ মিঞাকে বাবা দেওয়ানবাগীর মানতের নির্দেশিকা মুতাবেক আত্মারবানী চুবানো পানি খাওয়ালেন ও মানত করতে বললেন৷ এতেই শরীফ মিঞা সুস্থ হয়ে যান৷ সুস্থ হয়ে মানত আদায় করতে এস বাবা দেওয়ানবাগীর কাছে তরীকায় সামিল হন।

শরিফ ভাই বাবা দেওয়ানবাগীর নির্দেশে ভারতের খিদিরপুরে মোহাম্মদী ইসলামের একটি খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন৷ এখানে মহিলাদের অপেক্ষাকৃত ভিড় বেশি হতো৷ তাদের বহু বিবিধ সমস্যার জন্য এই খানকায়ে মানত করতো৷ তাতে তাদের বালা মুসিবত দূর হয়ে গেলে তারা মানত আদায় করত৷ শরিফ ভাই এবং আফজাল ভাই একটি সুফি সম্মেলনের আয়োজন করত৷ বাংলাদেশ থেকে দেওয়ানবাগ দরবার শরীফের প্রতিনিধিগণ আসতেন৷ তারা বাংলায় বাংলা ভাষায় বক্তব্য প্রদান করতেন৷ কিন্তু খিদিরপুর এলাকার ভাষাভাষীরা উর্দুভাষী৷ ফলে এই সম্মেলনের প্রভাব খুব একটা পড়তো না৷ এই রিপোর্ট বাবা দেওয়ানবাগী পাওয়ার পর ভাইদের একটা মানত করতে বলেন, যাতে বাংলাভাষীদের মধ্যে একজন তরিকার প্রচারক হয়৷ নেশার ভাইরা একটা মানত করেন৷
এই সময় আমি মুসলিমদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন ব্যস্ত ছিলাম৷ এর আগে 1972 সাল থেকে আমি তাবলীগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম৷ বহু চিল্লা তিন চিল্লা দিয়েছি, কিন্তু সন্তুষ্ট ছিলাম না৷ কারণ তাবলীগ জামাত মাটির তলার কথা অর্থাৎ কবরের কথা এবং আসমানের উপরের কথা অর্থাৎ জান্নাতের কথা বলে, কিন্তু মাটির উপরের কথা অর্থাৎ দুনিয়ার কথা দুনিয়ার সমস্যা এরা দেখেনা৷ তাবলীগের বাঁকিপুর আমি তাবলিগের আমির মাওলানা গোলাম আলী সাহেবের সঙ্গে এ বিষয়ে মত প্রকাশ করলাম৷ তিনি মেমারির বক্তা সম্রাট বলে খ্যাত গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন৷ গোলাম মোর্তোজা গোলেমালে সমাধান দেন৷ তবে তিনি আমার সঙ্গে একমত হলেন৷ ফলস্বরূপ আমরা একসঙ্গে হিযবুশ শরিয়ত করি এবং শুভ শক্তি পত্রিকা পরিচালনা করি৷ আমি হিজবুশ শরীয়ত এবং শুভশক্তি পত্রিকার সম্পাদনা করি৷ কিন্তু সেখানে মোর্তজার সঙ্গে আমার মত দ্বন্দ্ব হয়৷ এরপর সংখ্যালঘু তথা মুসলিমদের সংরক্ষণ আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম৷ সেই সময় কলকাতায় সংগঠনের স্বার্থে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলাম৷ এই উদ্দেশ্য নিয়ে খিদিরপুরে সুফি সংস্থা ও শরীফ ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসি৷ ওরা আমাকে বক্তা হিসেবে ওই সম্মেলনে দাওয়াত দেয় এবং বাঙালি লোকজনের আনার কথা বলে৷ আমি যেহেতু সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতা ছিলাম, তাই লোক আনা আমার কাছে সহজ ছিল৷ ওই সময় কয়েক লরি লোক গ্রাম থেকে নিয়ে আসি৷ এরপর শরিফ সাহেব এবং বাংলাদেশের দেওয়ানবাগ শরীফের প্রতিনিধিরা আমাকে ঢাকায় যেতে অনুরোধ করেন৷ সেখানে বিশ্ব সুফি সম্মেলনে দাওয়াত দেয়৷ আমি যথারিতি ওই সম্মেলনে হাজির হই৷ এখানে গিয়ে দেখলাম আমার এতদিনের জানা বোঝার সব বিপরীত৷ ওইখানে ওই সময় জামাতে ইসলামীর সাঈদী সাহেবের কোরআনের তাফসির মাহফিল হচ্ছিল৷ আমি যেহেতু আগে সাঈদী সাহেবের ভক্ত ছিলাম তাই, ওই মাহফিলে উপস্থিত হই৷ তিনদিন বক্তব্য ভালো লাগছিল৷ রাতে করে দেওয়ানবাগ দরবার শরীফের বাবে রহমতে বিশ্রাম নেই৷ যেহেতু আমি দেওয়ানবাগ শরীফের বিদেশি অতিথি ছিলাম, তৃতীয় দিনের মাহফিল সাঈদী সাহেব বাবা৷ দেওয়ানবাগীর বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় কথা বলে৷ এতে আমার খারাপ লাগছিলো, কারণ দেওয়ানবাগী হুজুর এর সঙ্গে আলাপ করে আমার মনে হয়েছিল উনি উচ্চপর্যায়ের সুফি এবং ভালো মানুষ৷ তার বিরুদ্ধে সাঈদী সাহেবের এরকম মন্তব্য করা উচিত হয়নি৷

এই সময় বাবা দেওয়ানবাগীর সঙ্গে বহু আলাপ আলোচনা হয়৷ সাঈদী সাহেবের মতামত ব্যক্ত করলাম৷ বাবা দেওয়ানবাগী সমস্ত মত যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করলেন৷ কোরআন হাদিস দিয়ে তার মত প্রতিষ্ঠা করলেন৷ প্রায় তিন দিন ধরে এইভাবে আমি ওনার সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা মত বিনিময় করলাম৷ উনি দয়া করে আমাকে তা বুঝিয়ে দিলেন৷ আমি ইতিমধ্যে তরিকা নিলাম৷ একপর্যায়ে উনার সামনে বসে আমার দিল টা ফেটে যাচ্ছিল৷ আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, বাবা আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে৷ উনি বললেন, গোনার পাহাড় টা ফেটে যাচ্ছে৷ আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে৷ এইযে আমার কান্না শুরু হলো আর থামে না৷ এরপর থেকে আমি ওনার আশেক হয়ে গেলাম৷ সেই থেকে শুরু হল আমার তরিকা প্রচার৷

ক্রমশ চলতে থাকবে…

Scroll to Top