ভারতে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচার ও পটভূমিকা- ৫ম পর্ব।

ভারতে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচার ও পটভূমিকা- ৫ম পর্ব। লেখকঃ আশেকে রাসুল আক্কাস আলী।

মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারে নিজের এলাকা বেছে নিলাম৷ এ সময় তাবলীগ জামাতের একটা জামাত আমাদের মসজিদে আসে৷ আমি তাদের কাছে যাই ৷তারা আমাকে নিয়ে রাহাবা করে মানুষের কাছে দাওয়াত দিতে লাগলো৷ সন্ধ্যার সময় সবাই উপস্থিত হল৷ মাগরিবের নামাজের পরে বয়ান শুরু হল৷ প্রথমে আমির সাহেব আমাকে কিছু বলতে বলল৷ আমি মিলাদের গুরুত্ব বুঝিয়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সালামে কেয়ামে দাঁড়িয়ে গেলাম৷ এতে মরা পিয়া মাদ্রাসার হেড মুদারিস রশিদ সাহেব খুব রেগে গেলেন৷ তিনি প্রচণ্ড মিলাদ বিরোধী ছিলেন৷ এরপরে পরের সপ্তাহে আমাদের মসজিদে আবার একটি নামকরা জামাত মগরাহাট থেকে পাঠিয়ে দিলেন৷ সেখানেও আমি বয়ান করে মিলাদে সালাম কেয়াম শুরু করলাম৷ এতে ওই মাদ্রাসার মাওলানা সাহেব খুব রেগে গেলেন৷ তিনি জামাতের আমির সাহেব কে বারবার বলেছিলেন সালাম কিয়াম না করতে৷ কারণ এটা তাদের আকিদার খেলাপ৷ আসলে এরা ছিল ওয়াহাবি৷
আমি এদের সঙ্গে আগে চলতাম৷ আমার মুর্শিদ বাবা দেওয়ানবাগীর দরবারে গিয়ে মিলাদ সালামের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলাম৷ রাসুলকে ভালবাসার নাম ঈমান৷ রাসুলের সঙ্গে দিদার পেতে গেলে খাস করে মিলাদ এর গুরুত্ব দিতে হবে৷ এ কারণে আমাদের গ্রামের মসজিদে রোজ এশার নামাজের পরে মিলাদ পড়তাম৷ সমস্ত মুসল্লীরা প্রথম প্রথম মিলাদ পড়তো৷ পরে ইমাম সাহেব ফুরফুরা পন্থী, এরা মিলাদ পড়ে৷ কিন্তু তারা হিংসা করতে লাগলো৷ যেহেতু আমার মুর্শিদ বাবা দেওয়ানবাগী, তাই সে তাদের মুসল্লিদের বিশেষ করে ফুরফুরা পন্থীদের বোঝাতে লাগলো এটা আমাদের সিলসিলার বাইরে৷ আসলে তো এরা নবীর সিলসিলা করে না প্রকৃতপক্ষে নবীকে ভালবাসে না৷ এরা শুধু ফুরফুরা শরীফ কে চিনত৷ যদিও ফুরফুরা দাদা হুজুর বলে খ্যাত হযরত আবু বকর সিদ্দিক রহমাতুল্লাহ আলাইহের সঙ্গে তাদের কোন রুহানি যোগাযোগ ছিল না৷ এরা শরীয়ত ছাড়া কিছু বুঝতো না৷ যাই হোক মিলাদ নিয়ে মসজিদে দুটো ভাগ হয়ে গেল৷ একদল আমার পক্ষে, আরেকদল মিলাদ পড়ে না তবে বিপক্ষে নয়৷ কারণ সবাই তাবলীগ বিরোধী ছিল৷ তাবলীগ জামাত এসে মিলাদ পড়েছে, কিয়াম করেছে, এই খবর শুনে তাবলিগ মারকাজের লোকেরা খুবই বিব্রত বোধ করেছে৷ তারা ক্রমান্বয়ে আমার উপর হিংস্র হয়ে উঠলো৷ এ সময় আমরা প্রতিটি মসজিদে মসজিদে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতাম৷ তাবলীগ জামাতের কায়দায় আমরা মুসল্লিদের দাওয়াত দিয়ে মিলাদ পড়তাম৷ওহাবীরা যখন যুক্তিতে আমাদের কাছে পারেনি, তখন এরা পিছন থেকে ষড়যন্ত্র শুরু করলো৷ আমাদের জাকের বাড়তে লাগল৷ দরবার থেকে দেখে আসা এক জাকের ডেভিস আবাদের হান্নান ভাইয়ের বাড়িতে এক মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করল৷ আমাদের প্রতিটি মাহফিলে তখন মাইক থাকতো এবং তাবারুকের ব্যবস্থা করা হতো৷ ইতিমধ্যে তাবলীগ জামাতের কর্মকর্তারা এলাকার সমাজবিরোধীদের সঙ্গে হাত মেলালো৷ তারা আমাকে খুন করার ষড়যন্ত্র করলো৷ হান্নান ভাইয়ের বাড়িতে মিলাদে আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় শতাধিক লোক সশস্ত্র অবস্থায় আমাদের ঘিরে ধরল, স্টেজে আমার সাথীদের ওপর হামলা করল এবং আমাকে তারা ধরে প্রচন্ডভাবে প্রহার করতে লাগলো৷ আমি এক পর্যায়ে মাটিতে পড়ে গেলাম, এই সময় আমার মুর্শিদের কথা মনে পড়ল, আমি যখন প্রথমবার দরবার থেকে বাড়িতে বাবা দেওয়ানবাগীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন, বিপদে পইড়া দেখেন মুর্শিদ আছে কিনা বুঝতে পারবেন৷ আমি তাই ওই বিপদের সময় বাবা দেওয়ানবাগী —বলে একটা চিৎকার দিলাম৷ চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে আমি কয়েক রশি দূরে মহিলারা যেখান থেকে ওয়াজ শুনছিল তাদের মধ্যে পড়ে গেলাম৷ কিভাবে উড়ে যাওয়ার মত অবস্থায় গেলাম আমি জানিনা৷ আর যারা মারছিল তারাও জানেনা৷ তারা আমার পরিহিত ছিন্ন বিচ্ছিন্ন জামার উপরে আক্রমণ করেছিল৷ কিন্তু আমি ওখানে নেই৷ আমি তখন মহিলাদের মধ্যে৷ ওই মহিলারা মায়ের চোখে মায়ার চোখে আমাকে একটা ঘরে লুকিয়ে রাখে৷ সেখান থেকে আমি সব দেখতে পাচ্ছিলাম৷ আমার সঙ্গী সাথীদের উপরে খুব মারধোর করছিল৷ হান্নান ভাইয়ের উপরে খুব ধমক দিচ্ছিল৷ তার মেয়েদের মারধোর করছিল৷ বাইরে বোম পড়ছিল৷ তারা কোন প্রমাণ রাখবে না বলে কারেন্টের তার কেটে দিয়েছিল৷ অন্ধকারে এসব হচ্ছিল৷ ইতিমধ্যে তারা এই দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চলে গেল৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে এলো৷ এসে তারা বলাবলি করছিল, লাশটা কোথায় গেল ? অর্থাৎ আমাকে তারা লাশ ভেবেছিল৷ কিন্তু আমি তখন জীবন্ত একটা ঘরের মধ্যে আত্মগোপন করে রয়েছি৷ এরা লাইট মেরে মেরে দেখছিল৷ আর বলছিল, লাশ গুম করতে হবে৷ পাশে নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে৷ কিন্তু লাশ খুঁজে পাচ্ছিল না৷ অনেকক্ষণ তারা খোঁজাখুঁজি করল তারপর চলে গেল৷ আবার এলো, খুঁজতে লাগলো খুব৷ কিন্তু না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে চলে গেল৷ অধিক রাতে চারদিকে যখন নিশ্চুপ, আমি আত্মগোপন ছেড়ে এরা অর্থাৎ হান্নান ভাইয়ের বাড়ির লোকেরা আমাকে আমার বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল ৷আমি বাড়িতে পৌছাবার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার এলো৷ কারণ তার ভাই লোকমান সাহেব খুব আহত হয়েছিল, রক্তাক্ত হয়েছিল৷ আর আমাকে আটকে রেখেছিল৷ সুতরাং আমি যে প্রচন্ডভাবে আহত, এ কারণে ওই ডাক্তার ছুটে এসেছিলেন৷ আশেপাশের লোকেরা এরাও ছুটে এলো৷ কেউ মজা দেখতে এলো, কারণ ওহাবীরা ফুরফুরা পন্থী রা আমাদের সামনে যুক্তিতে এঁটে উঠতে পারছিল না৷ কিন্তু আশ্চর্য আমার দেহে একটুও আঁচড়ের দাগ নেই৷ তারপর দিন যখন আমি বাজারে গিয়েছিলাম, অনেকে মর্মাহত হয়েছিল৷ কিন্তু আমাকে অক্ষত অবস্থায় দেখতে পেয়ে সবাই অবাক হয়ে গেল৷ আসলে আমার মুর্শিদ বাবা দেওয়ানবাগী সেদিন রাতে আমাকে অলৌকিক ভাবে সুরক্ষা দিয়েছিলেন৷ ওই রাতে আমি বাড়িতে এসে রহমতের সময় খুব কান্নাকাটি করেছিলাম৷ মোরাকাবা অবস্থায় ফুরফুরা দাদা হুজুর পীর কেবলা কে দেখলাম, উনি একহাতে মেজ হুজুরের মাথায় রেখেছেন আর এক হাত বাকি বিল্লাহ হুজুরের মাথায় রেখেছেন৷ এর আগে রহমতের সময় মোরাকাবায় বসিরহাটের এক জলসার পরে জাকের ভাইয়ের বাড়িতে বলেছিলেন, আমি তোমার সঙ্গে আছি৷ তুমি তরিকার কাজ চালিয়ে যাও৷ আরো আমার ব্যক্তিগত কিছু সমস্যা সমাধানের কথা বললেন৷ তিনি এও বলেছিলেন, আমার নাতিরা আমার সঙ্গে রুহানিতে যোগাযোগ করে না৷ তুমি যোগাযোগ করলে, তুমি বড় সৌভাগ্যবান৷ সেদিন তিনি বলেছিলেন, রুহুল আমিন সাহেব সমস্ত কেতাবে আমার অনুমোদন নেয়নি৷ এখানে অনেক ভুল আছে৷ পরবর্তীতে রুলামিন সাহেবের তরিকত দর্পণে প্রায় 16 টি মৌলিক ভুল দেখতে পেয়েছিলাম৷ যেমন একটি ভুল তিনি বলেছিলেন, মৃত ব্যক্তি কিছু করিতে সক্ষম নয়৷ কিন্তু মৃত ব্যক্তি কবরের সওয়াল জবাব করে একথা সবাই বিশ্বাস করে৷ মৃত ব্যক্তি যদি জবাব করতে পারে, কবর জিয়ারতের সালামের উত্তর দিতে পারে ,আর ওলীআল্লাহ কিছু করতে পারবে না ? এটা কেমন আকিদা ? আসলে সে শেষ জীবনে ওয়াহাবি হয়ে গিয়েছিল৷ সে বলেছিল আল্লাহ আকার নয়৷ প্রমাণ হিসেবে বলেছিল, লাইসা কামিসলিহি শাইয়ুন অর্থাৎ তিনি কারো মত নন, কোন বস্তুর মতো নয়৷ যেহেতু বস্তু আকার, তাই তাদের মতো নয়, মানে নিরাকার৷ কিন্তু প্রতিটি মানুষ কেউ কারো মতো নয়৷ প্রত্যেকের মুখশ্রী আলাদা কন্ঠ আলাদা হাতের আঙ্গুলের ছাপ আলাদা৷ তাহলে কি মানুষ নিরাকার? মানুষ তার স্বরুপে বিদ্যমান৷ প্রত্যেকে প্রত্যেকের মত৷ আল্লাহ ও স্বরূপে বিদ্যমান৷ আল্লাহ আল্লাহর মত৷ কারো মতো নয়৷ আল্লাহর রক্তমাংসের নয়, মানুষ নয়, হাতি ঘোড়া নয়, আল্লাহর নূরের৷ আল্লাহ নুরময় সত্তার অধিকারী৷ এছাড়া রুলামিন সাহেব বলেছিল, আল্লাহ আরশে সমাসীন নয়৷ কোরআনে বহু আয়াতে আল্লাহ আরশে সমাসীন বলেছেন৷ যাই হোক ফুরফুরা শরীফের দাদাহুজুর যেহেতু আমাদের পূর্বপুরুষ, বাবাজান আমাকে তাকে মানতে বলেছিলেন৷ তাই আমি বাবার নির্দেশে ফুরফুরা শরীফে গিয়েছিলাম৷ এর আগে একবার মাত্র গিয়েছিলাম৷ কারণ আমি তো আগে তাবলীগ করতাম৷ তাবলীগে অলি আল্লাহদের তেমন মানতে চায় না৷ দাদা হুজুরের দুই হাত ছেলে এবং নাতির মাথায় দেখার পর আমি অভিমান করলাম৷ কারণ হান্নান ভাইয়ের বাড়িতে ওই গন্ডগোলের তাবলীগ এবং ফুরফুরা একসঙ্গে আমাকে আক্রমণ করেছিল৷ এর আগে মেজ হুজুর বলেছিলেন দেওয়ানবাগী ছাড়ো৷ তার কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, দেওয়ানবাগীকে অর্থাৎ তার মতকে এলাকায় না ঢোকাতে৷ তাই তার ভক্তরা এই ষড়যন্ত্র করেছিল তাবলীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে৷ আমি তাই দাদা হুজুর কে রুহানীতে মুরাকাবায় বললাম, (আমার মুর্শিদের কদম ধরে) আমি আর এভাবে তরিকার কাজ করতে পারবোনা৷ এত অপমান এত অত্যাচার আমি সইতে পারবো না৷ আমি দুনিয়ায় এভাবে থাকতে চাইনা৷ তরিকার কাজ যদি না করতে পারি আমাকে তুলে নিন৷ অথবা আপনার ছেলে এবং নাতিকে তুলে নিতে হবে৷ পরবর্তীতে ইতিহাস সবার জানা। (ক্রমশ চলতে থাকবে)
Scroll to Top